বাংলার সুলতানি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল শাসক হযরত সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (রহ.)-এর পবিত্র মাজার শরীফ আজও ইতিহাসের গৌরব বয়ে চলেছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার শাহচিলাপুরে। কষ্টিপাথরে নির্মিত এই স্থাপনা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত “কালা দরগা” নামে। শতাব্দী পেরিয়ে আজও এটি ধর্মপ্রাণ মানুষ, ইতিহাসপিপাসু গবেষক এবং পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। মধ্যযুগীয় বাংলার এক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য-নিদর্শন হিসেবে এই মাজার শরীফ শুধু একটি সমাধি নয় বরং এটি একটি সময়, একটি শাসনদর্শন এবং এক সংস্কৃতিসচেতন শাসকের চিরন্তন স্মারক।
শাসক পরিচিতি : প্রজ্ঞাবান ও সংস্কৃতিপ্রেমী সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (ফার্সি: غیاث الدین اعظم شاہ) ছিলেন ইলিয়াস শাহী রাজবংশের তৃতীয় সুলতান। তাঁর শাসনকাল ছিল ১৩৯০ থেকে ১৪১১ সাল পর্যন্ত। শৈশব ও কৈশোরে তাঁর নাম ছিল আজম শাহ। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি “গিয়াসউদ্দিন” উপাধি গ্রহণ করেন। ইতিহাসবিদদের মতে, তিনি যুদ্ধজয়ের চেয়ে রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব, জ্ঞানচর্চা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করার প্রতি বেশি মনোযোগী ছিলেন। সে সময়ের তুলনায় তাঁর প্রশাসনিক কৌশল ছিল আধুনিকধর্মী এবং কৌশলনির্ভর।
কূটনীতি ও বৈদেশিক সম্পর্ক : যুদ্ধ নয়, বন্ধুত্বে বিশ্বাস গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের শাসনামল ছিল বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়নের স্বর্ণযুগ। তিনি চীনের মিং রাজবংশ-এর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৪০৫, ১৪০৮ ও ১৪০৯ সালে তিনি চীনে দূত পাঠান। সম্রাট ইয়ং লি পাল্টা দূত ও উপহার পাঠিয়ে এই সম্পর্ক দৃঢ় করেন। পারস্য, আরবভূমি, আসাম ও কামরূপ অঞ্চলের সঙ্গেও তাঁর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ছিল। মক্কা ও মদিনায় তিনি দূত পাঠিয়ে ‘গিয়াসিয়া মাদ্রাসা’ প্রতিষ্ঠায় আর্থিক সহায়তা দেন। এর মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছু সামরিক অভিযানের তথ্য পাওয়া গেলেও, তাঁর শাসননীতির মূল দর্শন ছিল স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং সংস্কৃতির বিকাশ।
সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার পৃষ্ঠপোষক: গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন কবি, পণ্ডিত ও সুফিদের বড় মাপের পৃষ্ঠপোষক। তাঁর শাসনামল ছিল এক ধরনের সাংস্কৃতিক রেনেসাঁর সময়। পারস্যের বিশ্বখ্যাত কবি হাফিজ শিরাজী-এর সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ ছিল। সুলতানের আমন্ত্রণের জবাবে হাফিজ যে গজল পাঠান, তা মধ্যযুগীয় সাহিত্য ইতিহাসে এক বিরল দলিল হিসেবে গণ্য। এই সময়েই বাঙালি মুসলিম কবি শাহ মুহাম্মদ সগীর রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইউসুফ-জুলেখা’, এবং কৃত্তিবাস রামায়ণ বাংলায় অনূদিত হয়—যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মোড়। এক শাসকের কাছে এটি ছিল কেবল রাজনৈতিক সাফল্য নয়—এ ছিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধের প্রকাশ।
শাহচিলাপুরে মাজার শরীফ : ইতিহাসের স্থাপত্য নিদর্শন নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার মোগড়াপাড়া থানার শাহচিলাপুর এলাকায় অবস্থিত এই মাজার শরীফ কষ্টিপাথর দ্বারা নির্মিত। স্থানীয়রা একে ‘কালা দরগা’ নামে ডাকে। মাজারটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। দিনের আলোতে যেমন এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব চোখে পড়ে, তেমনি সন্ধ্যার নিস্তব্ধতায় যেন ইতিহাস নিজেই কথা বলে উঠে। সারা বছর এখানে জিয়ারত, মিলাদ মাহফিল ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বহু মানুষ মানসিক শান্তি ও আধ্যাত্মিক প্রশান্তির আশায় এখানে আসেন।
ইন্তেকাল ও স্থায়ী স্মৃতি: ১৪১১ সালে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ইন্তেকাল করেন। তাঁকে এখানেই সমাহিত করা হয়। শতাব্দী পেরিয়েও তাঁর নাম ও অবদান বেঁচে আছে ইতিহাসে, সাহিত্যে ও মানুষের স্মৃতিতে। এই মাজার শরীফ আজ কেবল একটি সমাধিক্ষেত্র নয় এটি বাংলার সুলতানি যুগের এক জীবন্ত দলিল।
উপসংহার: হযরত সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (রহ.) ছিলেন একাধারে দূরদর্শী শাসক, সংস্কৃতিপ্রেমী পৃষ্ঠপোষক ও ধর্মীয় অনুশাসনের ধারক। তাঁর গড়ে তোলা কূটনৈতিক সেতুবন্ধন, শিক্ষা বিস্তারের ভূমিকা ও সাহিত্যচর্চার অবদান আজও ইতিহাসের পাতায় শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। শাহচিলাপুরের এই মাজার শরীফ তাই কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি বাংলার আত্মপরিচয়ের অংশ।
এই সাইটের সব ধরণের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও এবং ভিডিও কন্টেন্ট কপিরাইট আইন দ্বারা সুরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই কন্টেন্ট ব্যবহারের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনত শাস্তিযোগ্য। আমরা আমাদের ব্যবহারকারীদের একটি সুরক্ষিত ও তথ্যবহুল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমাদের নিউজ সাইটের মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো তথ্য ব্যবহারের আগে দয়া করে সেই তথ্যের উৎস যাচাই করতে ভুলবেন না। আপনাদের সমর্থন এবং সহযোগিতা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। আমাদের সাথেই থাকুন, সর্বশেষ খবর এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে।
