বাজারে ছেঁড়া-ফাটা, জোড়াতালি দেওয়া ও মলিন কাগুজে নোটের ছড়াছড়ি। বিশেষ করে ১০, ২০ ও ১০০ টাকার নোটের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। এসব নোট নিয়ে বিপাকে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পরিবহনকর্মীরা। আবার ব্যাংকে গেলেও একদিনে সব টাকা বদলানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, কাগজ ও কালি সংকটের কারণে নতুন নোট ছাপানো ও সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে ছেঁড়াফাটা নোটের ভোগান্তি কবে কাটবে, সেই প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।
বাজারে অচল টাকার চাপ: রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, ছেঁড়া-ফাটা ও জোড়াতালি দেওয়া নোটের লেনদেন বাড়ছে। অনেকের কাছে একাধিক ক্ষতিগ্রস্থ নোট জমে থাকলেও সেগুলো সহজে বাজারে চালানো যাচ্ছে না। ব্যাংকে নিয়ে গেলেও সব টাকা একসঙ্গে বদলে নতুন নোট পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ গ্রাহকদের। একটি হাসপাতালের ক্যান্টিনে কাজ করা সাইদুল ইসলাম বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ স্বল্প ব্যয়ে খাবার খান। বিল পরিশোধের সময় অনেকেই ছেঁড়া বা মলিন নোট দেন। অনেককে অনুরোধ করি এ টাকা না দিতে। কিন্তু কেউ কেউ বলেন, তাদের কাছে আর টাকা নেই, পেটেও ক্ষুধা। মানবিক দিক বিবেচনা করে টাকা নিতে হয়। এখন এসব নোট জমে গেছে। পাশের ব্যাংক শাখায় গিয়েও একদিনে সব বদলাতে পারছি না। ভালো করতে গিয়েই এখন বিপাকে পড়েছেন বলে জানান সাইদুল।
ব্যবসায়ীদেরও একই চিত্র: মগবাজারে দীর্ঘদিন ধরে সবজি বিক্রি করা হোসনে আরা বলেন, নিয়মিত ক্রেতাদের কাছ থেকে দু-একটি করে ছেঁড়া নোট নিতে হয়। পরিচিত ক্রেতা বলে ফেরত দিতে পারি না। কিন্তু ব্যাংকে গিয়েও সব একসঙ্গে বদলানো যায় না। কয়েক ধাপে বদলাতে বলেছে। ব্যবসা রেখে বারবার ব্যাংকে যাওয়া সম্ভব হয় না। এতে সময় ও অর্থ দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ তার।
বাসে ভাড়া হিসেবে ছেঁড়া টাকা: একটি পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার মামুন বলেন, অন্য কোথাও না চলা ছেঁড়া নোট অনেক যাত্রী ভাড়া হিসেবে দেন। নিতে না চাইলে যাত্রী খারাপ ব্যবহার করেন, বলেন আর টাকা নেই। বাধ্য হয়ে নিতে হয়। কিন্তু দিনশেষে মালিককে এসব টাকা দিতে পারি না। তখন আমাদেরই সমস্যা হয়। তিনি আরও বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ব্যাংক বন্ধ থাকায় নোট বদলানোর সুযোগ কম। অনেক সময় লোকসান দিয়ে গুলিস্তানের ফুটপাতের অস্থায়ী টাকার হাটে কম মূল্যে ছেঁড়া টাকা বদলাতে হয়।
যা বলছে ব্যাংক: একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা মাহবুব বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন নোট সরবরাহ খুবই সীমিত। একবারে সব ছেঁড়া নোট বদলে দিলে বাজারে নগদ টাকার সংকট দেখা দিতে পারে। তাই অল্প অল্প করে বিনিময় করা হচ্ছে।
কাগজ-কালি সংকটে ছাপা কমেছে: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নোটের কাগজ সরবরাহে সমস্যা হওয়ায় নতুন নোট ছাপানোর গতি কমেছে। বিদেশ সফরের সময় কাগজ সরবরাহ নিয়ে আলোচনা হলেও নির্ধারিত পরিমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, ২০০ টাকার নোট ছাপানোর জন্য আনা কিছু কাগজ মানসম্মত না হওয়ায় ফেরত পাঠাতে হয়েছে। নোটের কাগজ ও কালি বিশ্বে অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন করে, ফলে সরবরাহ সীমিত এবং দীর্ঘ অপেক্ষা তৈরি হয়েছে।
ক্যাশলেস লেনদেনের লক্ষ্যের দিকে সরকার: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, সরকার ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যেও কাজ করছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নগদ লেনদেন এখনো ব্যাপক। কাগজের ঘাটতির কারণে আগের মতো বড় বান্ডেলে নতুন নোট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না; সীমিত পরিমাণে বাজারে ছাড়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, নতুন নোট সরবরাহ স্বাভাবিক হতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে। কাগজ সরবরাহে সমস্যার কারণে নতুন নোট ছাপানোর গতি কমে গেছে। সরকারের লক্ষ্য ধীরে ধীরে ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ে তোলা। তাই একদিকে যেমন ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত পরিমাণে নতুন নোট ছাপানো হচ্ছে। তিনি বলেন, নতুন গভর্নর দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকেই বলেছেন যে ক্যাশলেস বাংলাদেশ একটি জাতীয় লক্ষ্য এবং সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে।
এই সাইটের সব ধরণের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও এবং ভিডিও কন্টেন্ট কপিরাইট আইন দ্বারা সুরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই কন্টেন্ট ব্যবহারের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনত শাস্তিযোগ্য। আমরা আমাদের ব্যবহারকারীদের একটি সুরক্ষিত ও তথ্যবহুল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমাদের নিউজ সাইটের মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো তথ্য ব্যবহারের আগে দয়া করে সেই তথ্যের উৎস যাচাই করতে ভুলবেন না। আপনাদের সমর্থন এবং সহযোগিতা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। আমাদের সাথেই থাকুন, সর্বশেষ খবর এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে।
