ঢাকামঙ্গলবার , ৬ জানুয়ারি ২০২৬
  1. অপরাধ ও দুর্নীতি
  2. আইন-আদালত
  3. আজ দেশজুড়ে
  4. আজকের সর্বশেষ
  5. আন্তর্জাতিক
  6. কৃষি সংবাদ
  7. খুলনা
  8. খেলাধুলা
  9. চট্টগ্রাম
  10. চাকরি-বাকরি
  11. ছড়া-কবিতা
  12. জাতীয়
  13. জীবনযাপন
  14. ঢাকা
  15. তথ্যপ্রযুক্তি
আজকের সর্বশেষ সবখবর

এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারিনি

॥ বিমল কান্তি দাস ॥
জানুয়ারি ৬, ২০২৬ ১১:২০ অপরাহ্ণ
Link Copied!

সুজয় রায় চৌধুরী বিকু ছিলেন গানের মানুষ। খুব ছোটবেলা থেকেই তিনি নানান অনুষ্ঠানে গান গেয়ে গেয়ে বড় হয়েছেন। তাঁর স্কুল ও কলেজ জীবনের বন্ধুরা তাঁকে গানের শিল্পী হিসেবে দেখে এসেছেন। ছাত্র জীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাই ছাত্র ইউনিয়ন, উদীচী ও কমিউনিস্ট পার্টির মতাদর্শ ও প্রভাব তাঁর সংগীত সাধনার সাথে যুক্ত হয়েছিল। তিনি ও তাঁর বন্ধুরা মিলে ছাত্র জীবন শেষে স্থানীয় ভিত্তিতে গড়ে তুলেছিলেন সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘উন্মেষ সাংস্কৃতিক সংসদ’।
১৯৯০ এর দশকে এবং তার পরও নারায়ণগঞ্জের শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে বা শ্রমিকদের বড় বড় সভা-সমাবেশে উন্মেষের গানের টিম নিয়ে সেখানে শ্রমিকদের পক্ষে তারা গান গেয়েছেন। ছাত্র ইউনিয়ন বা কমিউনিস্ট পার্টির সভা-সমাবেশেও গান গেয়ে শ্রমজীবী মানুষদের উৎসাহিত করেছেন। মানবমুক্তির সংগ্রামে শ্রমজীবী মানুষদের উৎসাহ যুগিয়েছেন।
সুজয় রায় চৌধুরী বিকু ছিলেন একজন সংগীত শিল্পী এবং একজন সংগীত শিক্ষকও। ছেলে মেয়েদের গান শেখানোর জন্য ‘অনন্যা সংগীত একাডেমি’ নামে নারায়ণগঞ্জ শহরে ছোট একটা গানের স্কুল তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানটি তিনি অনেক কষ্ট করে চালিয়ে এসেছেন। নারায়ণগঞ্জ শহরের অসংখ্য ছেলে মেয়ে তাঁর কাছে হাতে খড়ি দিয়ে গান শিখেছেন, গানের শিল্পী হয়েছেন। অনেকে তাঁর চেয়ে ওপরেও উঠেছেন। গানের মানুষ হিসেবে তিন দশকের অধিককাল ধরে নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি একটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে এসেছেন। তাঁর এই অবদানের জন্য নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তাঁকে চিরদিন মনে রাখবে।

সুজয় রায় চৌধুরী বিকু বর্তমান মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়ায় বালিয়াটি গ্রামে ১৯৬৮ সালের ৩১শে জানুয়ারি (আইডি কার্ড থেকে নেয়া) জন্মগ্রহণ করেন। বালিয়াটির জমিদার দীজেন্দ্র রায় চৌধুরী ছিলেন তাঁর পিতা। দীজেন্দ্র রায় চৌধুরী লন্ডন থেকে ব্যারিস্টারি পাশ করেছিলেন, কিন্তু জমিদারী দেখাশোনা করতেন, আইনজীবী পেশাকে তিনি পেশা হিসেবে নেননি। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারতবর্ষ ছেড়ে যাবার পর থেকে পূর্ব বঙ্গের জমিদারি প্রথা পর্যায়ক্রমে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাজেয়াপ্ত হতে থাকে। ১৯৫০ এর দশকে দীজেন্দ্র রায় চৌধুরীর জমিদারি চলে যায়। এরপর ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর তাঁর বসতভিটা শত্রু সম্পত্তি আইনের কথা বলে অন্যরা দখল করে নেয়। বাড়িঘর হারিয়ে পরিবার সমেত তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরে এসে ওঠেন। সুজয় রায় চৌধুরীর মাতা ছিলেন জমিদার বধু সুষমা রায় চৌধুরী। পিতা মাতার জমিদারি আমল সুজয় রায় চৌধুরী বিকু দেখার সুযোগ পাননি। পারিবারিক বিপর্যয় দেখতে দেখতে তিনি বড় হয়েছেন। তিনি বড় হয়েছেন নারায়ণগঞ্জ শহরে। নারায়ণগঞ্জ শহরের খানপুর বার একাডেমি স্কুলের ছাত্র ছিলেন তিনি। এরপর পড়েছেন নারায়ণগঞ্জ তোলারাম কলেজে। ছোটবেলা থেকে পারিবারিকভাবেই তিনি গান শিখেছিলেন, গানের মানুষ হয়ে উঠেছিলেন। স্কুল জীবন থেকেই তিনি গানের শিল্পী হিসেবেই পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর মৃত্যু পর্যন্ত তিনি গান নিয়েই ছিলেন। তিনি যেদিন মৃত্যুবরণ করেন (৪ জানুয়ারি ২০২৬) তার পূর্ব মুহূর্তে উপমহাদেশের প্রখ্যাত গণসংগীত শিল্পী সলিল চৌধুরীকে নিয়ে একটা সেমিনারপত্র লিখছিলেন; প্রগতি লেখক সংঘের আগামী সেমিনারে এই সেমিনারপত্র তাঁর উপস্থাপন করার কথা ছিল। লেখার বিরতি দিয়ে ঐদিন আনুমানিক দুপুর আড়াইটার পর স্নান করতে বাথরুমে গিয়ে তিনি ষ্ট্রোক করেন। হাসপাতালে নেবার পর ডাক্তাররা মৃত বলে জানান।
সুজয় রায় চৌধুরী বিকু শোষণ, বঞ্চনা ও সকল ধরনের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চেয়েছেন তাঁর সুর ও গানের মাধ্যমে। সুর ও সংগীতকে মেহনতি মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত করতে চেয়েছেন। গান গেয়েছেন প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে; বিনোদনের জন্য নয়, জীবনের প্রয়োজনে।
তিনি শুধুমাত্র সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত ছিলেন না, তিনি শ্রমিকশ্রেণির লড়াই-সংগ্রামের সাথেও যুক্ত ছিলেন। তিনি প্রগতি লেখক সংঘের নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সহ-সভাপতি ছিলেন। উন্মেষ সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি ছিলেন। সুকান্ত শতবর্ষ উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। সমমনা’র সদস্য ছিলেন। অনন্যা সংগীত একাডেমির প্রধান ছিলেন তিনি। এর বাইরে তিনি ছিলেন একজন স্বনামধন্য সংগীত শিক্ষক ও শিল্পী। রাজনৈতিক আদর্শ ও চিন্তায় তিনি ছিলেন একজন মার্কসবাদী, একজন কমিউনিস্ট। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবির নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, সিপিবি নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটি ও জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির সংস্কৃতি শাখারও তিনি সম্পাদক ছিলেন। এতগুলো পদ ও দায়িত্বে থাকার পরও তিনি ছিলেন একেবারেই সাধারণ একজন মানুষ। সামান্যতম অহংকার তাঁর মধ্যে কখনও দেখিনি। তিনি ছিলেন সহজ সরল সাদামাটা মানুষ। একজন কমিউনিস্টের আচরণে যে গুনাগুণ থাকা উচিত তার সবটুকু তিনি অর্জন করেছিলেন। মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন সকলের প্রিয় একজন মানুষ।
সুজয় রায় চৌধুরী বিকু সংগীতের চর্চা করেছেন শৈশব থেকেই, পারিবারিক পরিমণ্ডলে। ছাত্র জীবনে এসে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত হয়েছেন। তাঁর ছাত্র জীবনের যখন শেষ তখন রাশিয়াসহ সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিপর্যয় ঘটে গেছে। হয়তোবা একটু হতাশ হয়েছিলেন। ২০০০ সালের পর সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের পথ সম্পর্কে তিনি আবার আশাবাদী হয়েছেন। ধীরে ধীরে কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ করতে করতে পার্টির সাথে যুক্ত হয়েছেন। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ শহরের একটা পার্টি শাখায় যুক্ত হন, পরবর্তীতে একটা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এভাবে পর পর কয়েকবার তিনি নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জেলা কমিটির সদস্য ছিলেন, জেলা কমিটির সম্পাদক মন্ডলীতেও ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী পল্লবী প্রত্যাশা একজন কবি ও আবৃত্তি শিল্পী। তাঁর একমাত্র মেয়ে অর্কিতা রায় চৌধুরীও কবিতা লেখে, গান গায়। সে একজন নৃত্য শিল্পীও। তাঁর ছোট্ট পরিবারটির সবাই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত। অভাবের সংসার, কিন্তু নারায়ণগঞ্জে সকল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পরিবারের সদস্যরা সবাই যুক্ত থাকেন। মেয়ে অর্কিতা রায় চৌধুরী ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত আছে, কমিউনিস্ট পার্টির সাথেও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত আছে। কমরেড সুজয় রায় চৌধুরী বিকু শুধুমাত্র সংগীত শিল্পী ছিলেন না, তিনি গান লিখেছেন, গানের সুর দিয়েছেন। তিনি একজন লেখকও ছিলেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর অনেক মূল্যবান লেখাও আছে। তিনি নাটকের টিমের সাথেও কাজ করেছেন।
সুজয় রায় চৌধুরী বিকুর মৃত্যু আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি জানি, আমার মত অনেকেই তাঁর মৃত্যু মেনে নিতে পারবে না। আর যদি সকল দুঃখ, যন্ত্রণা বা আবেগ বাদ রেখেও বলি তবে বলতে হবে এই ক্ষতি পূরণ করা আমাদের সম্ভব হবে না।
পার্টিতে কাজ করার ক্ষেত্রে এমনকি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও আমরা ছিলাম অন্তরঙ্গ বন্ধু। সমাজ বাস্তবতা ও রাজনৈতিক মতামতের ক্ষেত্রে পার্টিতে আমরা ছিলাম একই দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ; উপলব্ধির দিক থেকেও আমরা খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম, আন্তরিক ছিলাম। প্রগতি লেখক সংঘের বিভিন্ন কাজে সুজয় রায় চৌধুরী বিকুর একটা বিশেষ ভূমিকা থাকত। পার্টির নারায়ণগঞ্জ শহর কমিটি পরিচালনার ক্ষেত্রে মূলত তিনিই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির ক্ষেত্রেও বিশেষ বিশেষ ভূমিকা তিনি পালন করতেন। সে ভূমিকা এখন কে পালন করবে? একজন সুজয় রায় চৌধুরী বিকু তো ৫/৭ বছরে তৈরি করা যায় না। কমপক্ষে ৩০/৩৫ বছরের নিরলস সাধনার মধ্য দিয়ে বিকুদা নিজেকে তৈরি করেছিলেন। সমাজ বিপ্লবের কাজে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত প্রাণ। তার মৃত্যু আমাদের মর্মাহত করেছে।
লাল সালাম কমরেড সুজয় রায় চৌধুরী বিকু – লাল সালাম।

লেখক : জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), নারায়ণগঞ্জ।

আমাদের সাইটে আমরা নিজস্ব সংবাদ তৈরির পাশাপাশি দেশের এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম থেকে গুরুত্বপূর্ণ খবর সংগ্রহ করে নির্ভুল সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। আমরা সবসময় তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং সঠিকতা নিশ্চিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। তবে, যদি কোনো সংবাদ নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকে, তাহলে আমরা আপনাকে বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি সংশ্লিষ্ট সংবাদ মাধ্যম বা নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করার জন্য।

এই সাইটের সব ধরণের সংবাদ, আলোকচিত্র, অডিও এবং ভিডিও কন্টেন্ট কপিরাইট আইন দ্বারা সুরক্ষিত। বিনা অনুমতিতে এই কন্টেন্ট ব্যবহারের প্রচেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনত শাস্তিযোগ্য। আমরা আমাদের ব্যবহারকারীদের একটি সুরক্ষিত ও তথ্যবহুল অভিজ্ঞতা প্রদানের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

আমাদের নিউজ সাইটের মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো তথ্য ব্যবহারের আগে দয়া করে সেই তথ্যের উৎস যাচাই করতে ভুলবেন না। আপনাদের সমর্থন এবং সহযোগিতা আমাদের এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। আমাদের সাথেই থাকুন, সর্বশেষ খবর এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে।
%d bloggers like this: